প্রধান শিক্ষকের বাণী

‘জুবিলীর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চাই’ সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, এডিটর, সুনামগঞ্জ মিরর ডটকম সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ মফিজুল হক মোল্লা এই স্কুলটিকে ভালোবেসে কাজ করতে চান। তিনি মনে করেন, জুবিলীর মানোন্নয়ন এবং একে এগিয়ে নিতে সফল হলেই স্বার্থক হবে তাঁর শিক্ষকতাজীবন। সোমবার সকাল ১০টায় সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে নিজ অফিসকক্ষে বসে সুনামগঞ্জ মিররের সম্পাদক সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ারের সাথে আলাপকালে বিভিন্ন বিষয় তোলে ধরেন তিনি। রাণী ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন ১৮৩৭ সালে। তাঁর সিংহাসন আরোহণের ৫০ বছর পূর্তিতে ১৯৮৭ সালে পালন করা হয় ‘গোল্ডেন জুবিলী’ উৎসব। এই উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘জুবিলী’ নামের ১৪টি বিদ্যালয়। সুরমার তীরঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় তার একটি। প্রধান শিক্ষক মোঃ মফিজুল হক মোল্লা বলেন, ‘আমি জুবিলী স্কুলের নামডাক অনেক আগে থেকেই শুনেছি। এই স্কুলেরই একজন ছাত্র ড. মোহাম্মদ সাদিক বাংলাদেশের শিক্ষাসচিব হয়েছেন, তাই এই স্কুল সম্পর্কে আর কোন বিশেষণের প্রয়োজন পড়ে না। জুবিলী একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ।’ তিনি বললেন, ‘এমন একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠে আমি প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’ প্রধান শিক্ষক মহোদয়কে প্রশ্ন করা হলো, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর কি কি উল্লেখযোগ্য সমস্যা তাঁর কাছে ধরা পড়েছে এবং তিনি কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। জবাবে তিনি বললেন, ২০০৭ সালের ৫ অক্টোবর থেকে এই স্কুল চলছিল ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এই দীর্ঘ সময়টায় পুরো স্কুলের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। এবছরের ৭ আগস্ট তিনি দায়িত্বগ্রহণের পর বিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রের স্থবিরতা দূর করার জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আলাপচারিতায় জানা গেল সেসব কথাও। জানা গেল, দু’টি শিফট মিলিয়ে বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রসংখ্যা ১৪৫৩ জন। একজন দক্ষ প্রশাসকের মত গড়গড় করে হিসেব বলে যেতে থাকলেন প্রধান শিক্ষক, বললেন এই ছাত্রসংখ্যার বিপরীতে শিক্ষক আছেন ৩৯জন, শূন্যপদ ১০টি। প্রধান শিক্ষক বললেন, স্কুলে বড়ধরনের কোন সংকট নেই। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও আছে। এরপর জানতে চাওয়া হল শিক্ষার মান সম্পর্কে। ‘পড়ালেখার মানের ব্যাপারে আপনার মতামত কি?’- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, গতবছর এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে ২০জনের বেশি। একটা জেলা স্কুলের এতটা খারাপ ফলাফল সবাইকে ভাবিয়ে তোলেছে। এজন্য তিনি বেশ উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। তিনি বললেন, ‘দেশের নামী স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষ হিসেব করে তারা কতগুলো এ প্লাস পেলো, অথচ আমরা এখনো পাশ-ফেলের হিসেবে আটকে আছি। সেই হিসেবে আমরা অনেকবেশি পিছিয়ে।’ এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরোণের জন্য স্কুলে লেখাপড়ায় বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে বলে জানালেন তিনি। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘অনেকসময় শিক্ষকেরা ঠিকমত ক্লাস নেন না। তারা নিজেদের বাসায় প্রাইভেট পড়াতে ব্যস্ত থাকেন। এজন্য স্কুলের নিয়মিত লেখাপড়ায় বড়ধরনের ব্যাঘাত ঘটে এবং এর প্রভাব পড়ে চুড়ান্ত ফলাফলে। তাই আমি ঠিকমত ক্লাস নেবার ব্যাপারে শিক্ষকদের ওপর জোর দিচ্ছি।’ লাইব্ররীর ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক জানালেন, লাইব্রেরী চালু আছে এবং ছাত্ররা সেখানে নিয়মিত বই পড়ছে। রকমারি বই নিয়ে লাইব্রেরী সমৃদ্ধ অবস্থায় আছে। তবে বিদ্যালয়ে ক্যান্টিন নেই। টিফিনের সময় স্কুল থেকে ছাত্রদেরকে টিফিন দেয়া হয়। ‘বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শেখার জন্য কি সুযোগ পাচ্ছে?’- জবাবে প্রধান শিক্ষক বললেন, স্কুলে নিয়মিত মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্টের সাহায্যে ক্লাস হয়। আলাদা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে, প্রতিদিন সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫টি ক্লাস নেয়া হয়। তবে তিনি জানান, কম্পিউটার ল্যাবের বৈদ্যুতিক লাইনে গোলযোগ দেখা দিয়েছে। মেরামতের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া তিনি এখানে যোগদানের আগে বিসিসির কম্পিউটার ল্যাবে চুরি হয়েছে। তাই তিনি ল্যাবের সুরক্ষা জোরদার করার জন্য গ্রিল ও কলাপ্সিবল গেট বসানোর ব্যবস্থা করেছেন। ইতোমধ্যে কাজ অনেকটাই শেষ হয়েছে। ‘বিদ্যালয়ে আরো কি কি উন্নয়ন প্রয়োজন?’- জবাবে প্রধান শিক্ষক বললেন, পানি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা আছে। ক্যাম্পাসে গভীর নলকূপ স্থাপন করার জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, স্যানিটেশনের সমস্যা এখানকার অন্যতম সমস্যা। তিনতলা ভবনের সাথে এটাচড্ টয়লেট নেই, স্কুলের পেছন দিকে যে টয়লেট আছে সেটা তিনতলা ভবন থেকে বেশ দূরে এবং ব্যবহারে অনেকটাই অনুপযোগী। টয়লেট নির্মাণের জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি আরো জানান, হোস্টেলের টিনশেড ঘরটা জীর্ণশীর্ণ দশায় আছে এবং দিনদিন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। একে মেরামত করা প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যালয়ের উন্নয়নে এবং ছাত্রদের সুবিধার জন্য ক্লাসরুমগুলোতে পুরনো ভাঙ্গা হোয়াইটবোর্ড পাল্টে নতুন হোয়াইটবোর্ড লাগানো হয়েছে, হোস্টেলের ছাত্রদের জন্য ফ্রিজ কিনে দেয়া হয়েছে, প্রধান শিক্ষকের অফিসকক্ষে গণ্যমান্য অতিথিদের বসার জন্য সোফাসেট আনা হয়েছে, এমন ছোটখাটো অনেক কাজ করা হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘মূল কাজ হল লেখাপড়ার মান বাড়ানো। শিক্ষার্থীদের ভাল ফলাফলের মধ্য দিয়ে জুবিলীর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। আমি সেজন্য সর্বাত্মকভাবে কাজ করতে চাই।’ লেখাপড়ার পাশাপাশি সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে স্কুলের সাফল্য সন্তোষজনক বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, বড়বড় অনেক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও আমাদের ছাত্ররা সাফল্য অর্জন করছে।’ এবার অন্যান্য প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক বললেন, স্কুলের বাইরের সৌন্দর্য্য রাস্তা থেকে দৃশ্যমান করার জন্য সামনের দেয়াল ভেঙ্গে তার ওপর গ্রিল বসানো হয়েছে। সদ্যসাবেক শিক্ষাসচিব ড. সাদিক (বর্তমানে এলপিআরে আছেন) মহোদয়ের ইচ্ছে অনুসারে সৌন্দর্য্যবর্ধনের জন্য বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছে। সবশেষে প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের কাছে জানতে চাওয়া হল, সুনামগঞ্জ কেমন লাগছে তাঁর কাছে। তিনি বললেন, ‘এই শহর খুব সুন্দর। হাওরবাওড়ে ঘেরা এই অঞ্চল আমার খুব ভাল লেগেছে। হাসনরাজা, আব্দুল করিম, রাধারমণেরা এই শহরের নাম পুরো দেশের কাছে তোলে ধরেছেন। এমন একটি জায়গায় এসে জেলার অন্যতম সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক হয়ে আমি আনন্দিত, আমার স্বপ্ন ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জুবিলীকে অনেকদূর এগিয়ে নেবো।’ পরিশেষে তিনি ধন্যবাদ জানান সুনামগঞ্জ মিররের সম্পাদক তাওসিফ মোনাওয়ারকে। সুনামগঞ্জ মিররের পক্ষ থেকেও তাঁকে ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানানো হয়।

ইতিহাস

সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ শহরের ডি. এস. রোডে বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমার তীরে মনোরম পরিবেশে ৬.৪৫ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। শুধু মাত্র বালকদের জন্য প্রভাতী ও দিবা দুই শিফ্টে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত্ম পাঠ দানে ব্যবস্থা আছে। নবম-দশম শ্রেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা চালু আছে। ভৌগলিকভাবে এটি ২৫°৭’১৬•২” উত্তর অক্ষাংশে এবং ৯১°৪০’৩৯” পূর্ব দ্রাঘিমা রেখায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানকাল: ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয়করণ হয়। ইতিহাস: ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মহারাণী ভিক্টোরিয়া রাণীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে রাণীর ক্ষমতা গ্রহণের ৫০ বৎসর পূর্তি উয্যাপন উপলক্ষে উপমহাদেশে ১৪ টি বিদ্যালয় ‘জুবিলী’ নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই বিদ্যালয়টি তাদের অন্যতম একটি। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়টি সুনামগঞ্জ জেলায় শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অর্জন রেখে চলেছে। মোট ছাত্র সংখ্যা: ১৫০৮ জন বর্তমানে পরিচালনা কমিটির সদস্য ১। সভাপতি - জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ। ২। সদস্য - সিভিল সার্জন, সুনামগঞ্জ। ৩। সদস্য - জেলা শিক্ষা অফিসার, সুনামগঞ্জ। ৪। সদস্য - সহকারী প্রকৌশলী, শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জ। ৫। সদস্য সচিব- প্রধান শিক্ষক, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।
Govt. Jubilee High School, Sunamganj